চোখের জেনা


khali

লিখেছেন- শাখা নির্ভানা

জয়নাব বেগম আছরের নামাজের সালাম ফিরিয়ে কেবল মোনাজাতে যাবে, অমনি কাজের মেয়ে দৌড়ে এলো খবর নিয়ে- আব্বাজানের ফোন এসেছে। মোনাজাত পরে করলেও চলবে, আব্বাজানের ফোনটা ধরাই জরুরী এখন জয়নাব বেগমের কাছে। পিতা তার হাদীসের শিক্ষকতা করছেন খোদ মক্কার ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে তা প্রায় ছয় বছর হয়ে গেছে। মা নেই, গত হয়েছেন যখন জয়নাব বেগমের বয়স সাত। বিয়ে হয়েছিল তার বনেদী ঘরে, বিধবা হয়েছেন পাঁচ বছর। সেই থেকে বাবাই তার মা, বাবাই তার সব। সেই পিতা তাকে ফোন করেছেন হাজার মাইল দূর থেকে। সে কি বসে থাকতে পারে? দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরলো জয়নাব বেগম।

-আসসালামোয়ালাইকুম, আব্বাজান কেমন আছেন?

-আলহামদুলিল্লাহ, আপনাকে দুয়েকটা কথা বলি আম্মাজান মন দিয়ে শোনেন। আল্লা আর তার রাসুলের পাবন্দি করাই মুসলমানের একমাত্র কাজ, আর কিছু না। আপনার স্বামী নেই, নিজের ইজ্জত-আব্রু-পর্দা-পুশিদা রক্ষা করে চলবেন, তাহলে কেয়ামতে আপনার বেহেশত নসিব হবে ইনশাল্লাহ, মনে রাখবেন।

-জ্বী আব্বাজান আমার ইয়াদ থাকবে।

-আপনি আর কিছু বলবেন আম্মাজান?

-না আব্বাজান আর কিছু বলবো না। আল্লাহ হাফেজ।

মেয়ের কাছে প্রায়ই ফোন করেন বাবা- কথাও বলেন নিজস্ব তরিকায়। টেপ রেকর্ডারের মতন একই সব দ্বীনের কথা কিছু সময় বলে রেখে দেন ফোন। মেয়ের আরাম আয়েশে কোন ফাঁক রাখেননি বাবা। একমাত্র সন্তান বলে কথা। কি জানি কি ভেবে মেয়ের অমতে আবার বিয়েতে চাপাচাপি করতে চাননি বাবা। মেয়েও তেমনি বাপগত প্রাণ। বাপের কথা অক্ষরে পালন করে চলেছে সে আজও, একদিনের তরেও বাপের কথার একটা অক্ষরও মাটিতে পড়তে দেয়নি মেয়ে। দ্বীনের কঠিন পথের সাথেই তার জীবনটা বাঁধা। তাই জীবনের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে সে নেকাব-বোরকা-দস্তানা-মোজা-রোদচশমা, বাইরের পৃথিবীর সাথে নিজেকে ফারাক করেছে সে এইসব উপকরন দিয়ে। এটাই রাসুলের নির্দেশের সাচ্চা ইসলাম।

পৌষ মাসের কোন দিন, কোন সকাল এত সুন্দর, এত ঝলমলে দেখেছে কিনা মনে পড়ে না জয়নাব বেগমের। খুবই ভাল লাগছে আজ তার। তারপরেও মনটা তার একটু বিক্ষিপ্ত, একটু চঞ্চল হয়ে আছে যেন। বাইরে যেতে মনটা কেমন আনচান করছে আজ। বাইরে সে যায়ও মাঝে মাঝে। তার যাবার জায়গাও ঐ দুটো- ফুফুজানের বাড়ীতে, আর বায়তুল মোকাররমের জুয়েলারীতে। আজকে যেতে হবে জুয়েলারীতে, কিনতে চায় সে অপূর্ব সেই এমেরাল্ড বসানো স্বর্ণহারটা- গত মাসে তার পছন্দ করে রেখে আসা জিনিসটা। মনে হয় ওটার জন্যেই তার মনটা উচাটন হয়ে আছে। সূর্য্য মধ্যগগনে পৌছার আগেই জয়নাব বিবি পরিচারিকাকে নিয়ে পৌছে যায় জুয়েলারীতে। বাঁধা খরিদ্দারকে দেখে সালাম দিয়ে এগিয়ে আসে দোকানী। কাজের মেয়ে সালামের উত্তর দেয় জয়নাব বেগমের হয়ে। বেগানা পুরুষের সাথে বিবির কথা বলার রীতি এমনই- চিরদিনের অভ্যাস। হেজাব পরা কাজের মেয়েকে খোচা দেয় বিবি- সেই হারটা দিতে বল।

-ওটার একটু সমস্যা আছে মালকীন। রিপিয়ার লাগবে। আর দামটা তো জানেন।

-হা দাম জানি। তাইলে আমি কাল এসে জিনিসটা নিয়ে যাবো, দামও দিয়ে যাব।

মালকীন কথা বলে না। আদবের সাথে দোকানীর সব কথার জবাব দেয় পর্দানশীন গৃহপরিচারিকা। বহুত দিনের পুরান পরিচিত শ্যকড়ার দোকান এটা। তারপরেও পারিবারিক ঐতিহ্য ভাঙতে চায় না জয়নাব বিবি। আর বেশী সময় দাড়ায় না তারা শ্যকড়ার দোকানে। দ্রুত পা ফেলে ঢুকে পড়ে অপেক্ষমান ক্যডিলাকে।

পরদিন রত্নহার নিতে আসে পরিচারিকা জুয়েলারীর দোকানে। দোকানের মালিক জানায়, কাজ এখনও বাকী আছে। আগামী পরশুদিন পুরাটা হয়ে যাবে। এমন ধনী নারীর আদবী গৃহপরিচারিকার সাথে একটুখানি খোশগল্প করতে মন চায় দোকানীর।

-তোমার মালকীন কিন্তু অসম্ভব সুন্দরী। একথা বললে মোটেও বেশী বলা হবে না।

-হায় আল্লাহ, আপনি কিভাবে তা দেখলেন? তিনি তো কারও সামনে নেকাব খুলেন না।

বিস্ময়ে আর শরমে লাল হলো পরিচারিকা।

-কেন, তোমার পিছনে দাড়ীয়ে ঐযে চশমা আর চোখ পরিস্কার করলেন কাল, তখনই দেখেছি।

-তাই, একথা কাউকে বলবেন না। কারন আমার মালকীনকে তার স্বামী ছাড়া আর কেউ কোনদিন দেখেনি, এমন কি সূর্য্যও না।

খালি হাতে গৃহপরিচারিকাকে ফিরে আসতে দেখে হতাশ হলো জয়নাব বেগম। জিনিসটা পাবার জন্যে মনটা তার উন্মুখ হয়ে আছে। কবে যে মিলবে ওটা!

-কি বললো দোকানী? কবে দিতে পারবে হারটা?

-পরশু দিবে মালকীন, কাজ আরো বাকী আছে।

-দোকানী আর কি বললো তোকে?

-তেমন কিছু না মালকীন, তবে…।

গৃহকর্মী সংকোচ করে বলতে।

-তবে কি, বল না।

-না মানে দোকানী বলছিল, আপনি নাকি ভীষণ খুব-সুরত।

জয়নাব বিবির গৌরবরণ চেহারা আগুনের মতন লাল হয়ে যেতে দেখে ভয় পেয়ে গেল গৃহকর্মী। গতপরশু দিনের সব কিছু একে একে মনে পড়ে গেলো বিবির।

-ঠিকাছে যা, হারটা আনতে যাবার আগে আমার কাছ থেকে একটা জিনিস নিয়ে যাস।

না জানি কি বেশরমের কথা গৃহকর্মীর মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেলো, তাই ভয় পেয়ে চলে গেলো সে।

ক্যডিলাকে চড়ে গৃহপরিচারিকা চলেছে রত্নহার আনতে। হাতে ধরা তার একটা পিতলের পাত্র, মুখ আঁটা তার শক্ত করে। আরো আছে একটা চিঠি। এই দুটো জিনিস দিতে হবে দোকানীকে। কি আছে ভিতরে? তরল জাতীয় কিছু মনে হচ্ছে। যাই থাক খুলতে মানা গৃহকর্মীর। দোকানীর হাতে দিলো সে জিনিস দুটো।

-আমার মালকীন পাঠিয়েছেন এইদুটো জিনিস আপনার জন্যে। আগে চিঠি পড়ে পরে পাত্র খুলতে বলেছেন।

দোকানী মনে অসীম কৌতুহল নিয়ে চিঠি পড়া শুরু করলো।

জনাব,

দোষ আমার। মনের ভুলে চশমাটা খুলেছিলাম। তাই আপনার চোখ আমার চোখ দেখে মুগ্ধ হলো। আপনার প্রিয় জিনিসটা যত্ন করে পাঠিয়ে দিলাম, আর আমার চোখকে আমি জেনার হাত থেকে মুক্তি দিলাম। এইই আমার রাসুলের শিক্ষা।

ইতি-

জয়নাব বিবি

চিঠির বিষয় বস্তু দোকানীর তেমন বোধগম্য হলো না। বোধে একটু আধটু আসলেও বিশ্বাস হলো না। দ্রুত কাঁপা হাতে পিতলের পাত্রটার ঢাকনা খুলে তার বিস্ময়ের আর সীমা-পরিসীমা রইলো না। দেখলো সে, পানিতে ভাসছে সদ্য তোলা একজোড়া চোখ- মানুষের চোখ। বিস্ময় আর অপরাধবোধের ধাক্কা সইতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ধরাশায়ী হলো সহজ-সাধারন স্বর্ণব্যবসায়ী। মাথায় বেশ চোট লেগেছে তার। কর্মচারীদের সেবায় জ্ঞান ফিরলে চারিদিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে সহসা প্রশ্ন করলো দোকানী- আমি কি পাপী? আমি কি গোনাহগার?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s