স্বার্থপরতা ও সামষ্টিক আত্মহনন


khali

লিখেছেন- শাখা নির্ভানা

মহর্ষি গৌতম বলেছিলেন- মানুষের জীবনে ভোগান্তি বা সাফারিং অবধারিত অনিবার্য। তাঁর এই কথার খেই ধরে আমার হিসেব কষতে ইচ্ছে হলো, কি কি ভোগান্তি আমাদের জীবনে অনিবার্য হয়ে আসে। প্রকৃতির থেকে আমরা পেয়েছি জন্ম, মৃত্যু, দুরারোগ্য ব্যাধি, বিভিন্ন বয়সের ক্রম, যেমন শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য ও জ্বরা। আরও আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, উল্কাপাত জাতীয় আরও বেশ কিছু দুর্যোগ, যা সাফারিং হয়ে আসে মানুষের সামষ্টিক জীবনের আঙ্গিনায়। এগুলোর ক্ষয়-ক্ষতি, ট্রমা মানুষ উন্নত প্রযুক্তি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষতিটা একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনার জন্যে উন্মুক্ত রয়েছে ভবিষ্যতের অবারিত প্রযুক্তি ও প্রজ্ঞা।

একদিন প্রকৃতি বিজিত হবে তার লক্ষণ বেশ পরিষ্কার। এগুলো বাদে আরও বহু সাফারিং এসে আমাদের দরজায় হানা দেয় প্রতিনিয়ত। কেড়ে নিয়ে যায় অমূল্য জীবন। প্রকৃতির দেয়া আবহমান দুর্যোগ, যেসব পুরোপুরি এনকাউন্টার করার যোগ্যতা এখনও মানুষ অর্জন করতে পারেনি, সেসব বাদ দিলে বাকী যেসব অগুনিত ভোগান্তি সামষ্টিক মানুষের জন্যে পড়ে থাকে, তার পুরোটাই ম্যনমেড বা মানুষের তৈরি। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ নামের সমসাময়িক যে দুর্যোগটাকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছি, তাও মানুষের তৈরি।

মানুষের অধিকাংশ সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত ভোগান্তি তার মূর্খতা, অজ্ঞানতা, স্বার্থপরতার কারণে সৃষ্টি হয়। মানুষের চরিত্রের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য পরাজয় মেনে না নেয়া। এই কারণে সে নিজেকে সবার কাছে সুখী ও জয়ী প্রমাণ করতে প্রয়াস পায়। সুখী প্রমাণ করতে চাই আনন্দ উল্লাস আর প্রাচুর্য। এই অবস্থানে এসেই সে ভুলে যায় সামষ্টিক আনন্দের কথা। নিজের কথা বা নিদেন পক্ষে নিজের গোষ্ঠীর স্বার্থ জেগে থাকে তার হৃদয়ে। জন্ম নেয় স্বার্থপরতার বীজ। এই বীজ এতটাই সর্বগ্রাসী যে ধীরে ধীরে তা একসময় সমস্ত মানব জাতির সামষ্টিক আত্মহননের কারণ হয়ে দাড়ায়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ স্বার্থপরতার তেমনই একটা ফলাফল। একই ধরণের আরেকটা ভোগান্তির কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যাতে পারে, সেটার নাম- নার্সিসিজম বা আমিই শ্রেষ্ঠ। এর জন্যে যাকিছু করার দরকার তা মানুষ করছে। ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও তার পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ উদ্ভূত ফলাফল মানুষের আরেক সামষ্টিক আত্মবিধ্বংসী কর্ম-প্রয়াস।

অনেকেই মানুষের এইসব জন্মগত বা বিল্টইন বৈশিষ্ট্যের কারণে উপসংহারের রেখা টেনে দিয়েছেন- মানুষ আসলে কালেক্টিভ সুইসাইডের দিকে এগুচ্ছে। মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেক অতিবুদ্ধিমান প্রাণীদের মতন মানুষেরও শেষ পরিণতি সামষ্টিক আত্মহত্যা বা ক্রমাগতভাবে অস্তিত্ব বিলোপ।

এখানে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে- উন্নত ব্যবস্থাপনা বা সেলফ-মোটিভেশনের মাধ্যমে মানুষ কি তার ধংসাত্মক ও নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রণ করে নিজের অস্তিত্বের সুরক্ষার মাধ্যমে সব দুর্যোগ জয় করে পরমানন্দের অবস্থানে পৌছাতে পারে না? জ্ঞানীরা বলেন- তার অন্তর্জগতে স্বার্থপরতা এত বেশী শক্তিমান যে তা সেলফ-মোটিভেশনের মতন একটা নান্দনিক শক্তিকে অতিক্রম করে যায়। তাই বিশ্বের অতিবুদ্ধিমান অপরাপর প্রাণীকুলের মতন মানুষকেও যেতে হবে সামষ্টিক আত্মহত্যার পথে।

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী বইয়ের পোকা এক স্বাপ্নিক কিশোরীকে একদা জিজ্ঞেস করেছিলাম- তোমার সাই-ফাই অনুসারে এলিয়ান যদি থেকেই থাকে, তবে তারা কেন পৃথিবীটাকে দখল করে নিচ্ছে না? উত্তরে সে বলেছিল- অতিবুদ্ধামান বা ইটিদের বিল্টিন ডিমেরিট হলো, তারা অতি-সেলফিশ, যার কারণে তারা কালেক্টিভ সুইসাইডের মতন কোন কাজের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি আর কোন এলিয়ান অবশিষ্ট নেই, যে তারা পৃথিবী ইনভেড করবে। যারা আছে তারা বহুদূরে। পৃথিবীতে আসতে তাদের বহু সময় লাগবে। ততোদিনে তাদের মতন করে একই ভাবে মানুষও শেষ হয়ে যাবে। এটা নাকি একটা জনপ্রিয় হাইপথেসিস, বলেছিল ইচড়েপাকা কিশোরী।

2 Comments

  1. পুরোটা মন দিয়ে পড়লাম। ভালো লাগলো লেখা। তবে মন খারাপ হলো এ জন্য যে আমরা সমষ্টিগত আত্মহত্যার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্ক রিপোর্ট অনুসারে গেল ২৯ জুলাই আমরা সারা বছরের প্রাকৃতিক সম্পদ সবার করে ফেলেছি। অনেক বছর ধরে আমরা এমন করছি। প্রাকৃতিক সম্পদ নবায়নের সময় দিচ্ছিনা। এদিকে খুব দ্রুত গতিতে কীটপতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। থাক আর মন খারাপ করা হতাশার কথা লিখতে চাইনা।

    Like

    1. আপনি সঠিক তথ্য উপাত্ত দিয়েছে। আমার মনেহয় ইটি বা বুদ্ধিমান প্রাণীদের নিয়ে হাইপথেসিসটা সত্য হতে চলেছে। এর ভিতরেও অনেক আশার আলো দেখছে। সেদিন অনলাইন একটা পোর্টালে পড়লাম আইসল্যন্ড, সুইডেন, কোস্টারিকা এমন প্রায় ১২টা দেশ ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারের খুব কাছাকাছি। তারা যদি পারে অন্যরা পারবে না কেন। ভুল রাজনীতি তার কারণ। আর মূলে রয়েছে স্বার্থপরতা। রিচার্ড ডকিন্সের ভাষায়- সেলফিশ জিন। উপায় নাই।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s