গণদেবতার পালস


khali

লিখেছেন- শাখা নির্ভানা

প্রকৃতির সবচেয়ে বড় একটা গুণ হলো, চরম অবস্থা থেকে সে নিজেকে প্রয়োজনে একটা গড়পড়তা অবস্থায় নিয়ে আসতে পারে। এই যেমন আমাদের এই আধাপরিচিত, আধাঅপরিচিত বিশ্বটা। সে সৃষ্টির শুরুতে বৃহৎবিস্ফোরণের সময় যেমন চরমভাবাপন্ন ছিল আজকে সে আর তা নেই। একটা গড়পড়তা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে। তার মাঝখানে আমাদের সৌরপরিবারের এক সদস্য পৃথিবীও পৌঁছেছে আরও স্থিতিশীল অবস্থায়। টেকসই জীবন ধারণের উপযোগী অবস্থায়। এটাই প্রকৃতির নিজস্ব ধর্ম। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতির মনে আগে থেকেই কি জীবন তৈরির পূর্বপরিকল্পনা ছিল? সেইমত সেকি পৃথিবী ও তার আশপাশের পরিবেশ তৈরি করেছে? নাকি কোন প্লানিং ছাড়া প্রকৃতি তার নিজস্ব ধর্মানুসারে গড়পড়তা জীবনোপযোগী অবস্থায় পৌঁছানোর পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবন সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে? এই প্রশ্ন অধিবিদ্যার, আমার নয়। আমার মতন একজন সামান্য পর্যবেক্ষক শুধু এইটুকুই বলতে পারে, প্রকৃতি তার চরম অবস্থা থেকে গড়পড়তা অবস্থানে পৌঁছানোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে তার সৃষ্ট জীবনের মধ্যে তথা মানুষ ও মনুষ্য সমাজে সন্নিবেশিত করেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

ব্যক্তি থেকে পরিবার। পরিবার থেকে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র থেকে গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বপল্লী। প্রকৃতি সবখানে হাজীর নাজীর। ডারউইনের ভাষায়- কৃত্রিম নির্বাচন মানুষকে ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। কৃত্রিম নির্বাচন জটিল কোন জীববৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়। মানব উদ্ভূত সর্বব্যাপী প্রযুক্তি একদিন মানুষের চলমান বিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করবে- এই ভবিষ্যতবাণী করে গেছেন স্বয়ং চার্লস ডারউইন। এটাই কৃত্রিম নির্বাচন। তারপরেও সমষ্টিবদ্ধ মানুষ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। কোনদিন তা সম্ভব হবে কিনা বলা যায় না। যেমন, এভারেজিং টেন্ডেন্সি বা গড়পড়তায়ন প্রবণতা, যা সমষ্টিবদ্ধ মানব সমাজে ক্রিয়াশীল, কারণ গড় করতে হলে একের অধিক সংখ্যার প্রয়োজন হয়। ব্যক্তির উপর গড়পড়তায়ন অন্যভাবে কাজ করে, ঠিক ঐভাবে সমষ্টির উপরে করে না।

কিভাবে গড়পড়তায়ণ সমষ্টির উপরে কাজ করে, সেই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। ধরা যাক একটা যৌথ পরিবার, যেখানে সদস্যসংখ্যা দশজন। যৌথভাবে করার জন্যে তাদের পিতামাতা তাদের একটা কাজ দিলেন। তাদের বলে দেয়া হলো, এই কাজের ফলাফল হিসাবে যে দ্রব্য উৎপাদন হবে তা একটা নির্দিষ্ট মূল্যে প্রত্যেকে কিনে নেবে। কাজ করার সময় দেখা গেল, কাজটা সম্পাদন করার জন্যে সবার বুদ্ধিমত্তার পরিসীমা ভিন্ন, কারও কম কারও বেশী। তারা প্রত্যেকে তাদের বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং কিছুটা আপোষহীন। তাদের ক্রয়সক্ষমতাও ভিন্ন- কারও কম, কারও বেশী। এই দুটো বিষয় মাথায় রেখে তারা যে পণ্য উৎপাদন করবে তাতে নিয়ামক হিসাবে কাজ করবে গড় মেধা ও গড় ক্রয়সক্ষমতা। এই হচ্ছে, সমষ্টির উপরে গড়পড়তায়ণের প্রত্যক্ষ প্রভাব। ঐ পরিবারে যদি একজন সদস্য থাকতো তবে সে তার নিজস্ব সকল সক্ষমতার গড়পড়তায়ন ঘটাত। সে তার বুদ্ধিমত্তা, কাঁচামাল ক্রয় ক্ষমতা, বিপণন সক্ষমতা, শারীরিক সক্ষমতা ও দক্ষতা, সবকিছুর একটা গড়পড়তায়ণের মাধ্যমে পণ্যটা উৎপাদনে নিয়োজিত হতো।

আমরা এবার সামষ্টিক গড়পড়তায়ণে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণে যাব। বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় একটা প্রবাদ আছে- দশে ভগবান বিরাজে। কথাটা কোন দিক দিয়ে, কতখানি সত্য সেই বিষয়েও আলোচনা করবো। গণদেবতা বলেও একটা প্রচলিত শব্দগুচ্ছ আছে, যেখান থেকে প্রশ্ন আসতে পারে- কেন জনগণকে দেবতা বলতে হবে? মানুষ বিরচিত ভগবানের একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো, সে তার সকল প্রাণকে সমান ভাবে আলো, বাতাস, পানি, ছায়া, তাপ দিয়ে প্রতিপালন করে। দশজন সমাজ সম্পৃক্ত মানুষ এক জায়গায় বসে সততার ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তে সবার স্বার্থ কমবেশি সাম্যতার সাথে রক্ষিত হয়। মানুষের প্রচলিত এই ধারণা বা বিশ্বাস বাস্তবতা প্রসূত, অলীক নয়।

একটা জাতির বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা বা আর্থিক সক্ষমতার গড়পড়তা উচ্চতা দ্বারা তাদের জীবনযাত্রার মান প্রভাবিত হয়, নিয়ন্ত্রিত হয়। ইচ্ছে করলেই হঠাৎ করে এই উচ্চতা বাড়ানো বা কমানো যায় না। এটি এমন একটি শক্ত সামাজিক প্যারামিটার যাকে সাময়িক ভাবে হয়তো দাবিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সময় ও সুযোগে সে বেরিয়ে পড়ে বিপুল বিক্রমে। অবদমিত অবস্থায়ও এই প্যারামিটার লীনভাবে কাজ করে যায় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবকাঠামোর উপরে। একজন ডিক্টেটরের ক্রিয়াকলাপ দেখলে মনে হবে, সে যেন দেশের পুরা জনসমষ্টিকে গলা টিপে ধরে নিজের মতন করে দেশ চালিয়ে যাচ্ছে। একনায়ক যে এই গড়পড়তায়নের অদৃশ্য ইশারায় নিজেকে পরিচালিত করে চলেছে তা সে বুঝতেও পারে না।

গণদেবতার এই গড়পড়তা অবস্থানের পরিবর্তন করা সম্ভব এবং তা করতে হবে দীর্ঘমেয়াদে এবং অসীম ধৈর্যের সমন্বয়ে। সেই দিক দিয়ে বলা যায় গড় বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা বা গড় আর্থিক সক্ষমতা জাতিতে জাতিতে ভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করে। পৃথিবীতে কোন কোন জাতির এই গড়পড়তায়নের মান বেশ উঁচুতে, কারও বা বেশ নীচে। কেন এই পার্থক্য? এই পার্থক্যের মূল দুইটি কারণ- রাজনৈতিক পদ্ধতিগত অবকাঠামো এবং জাতিগত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য তথা ভালকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করার সক্ষমতা। জাতিগত এই চরিত্র সব জাতিতে সমান নয়। এই কারণে কেউ সামান্যে অনেক দূর এগিয়ে যায়, আবার কেউ সামান্য এগুতেই গলদঘর্ম।

শিক্ষক থেকে শিল্পী, দাতা থেকে গ্রহীতা, শ্রমিক থেকে ক্রীড়াবিদ, সবারই নিজেকে ও নিজেদের সগোত্রীয় সমষ্টিবদ্ধ লোকদের সক্ষমতা ও গুণপনাকে এভারেজ বা গড় করার প্রবণতা ও ক্ষমতা থাকতে হবে। তবে এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যারা নেতা হবে, দেশ চালাবে, দিকনির্দেশনা দেবে জাতিকে তাদের এই গড়পড়তায়নের ক্ষমতাটা থাকতে হবে সবচেয়ে বেশী। কখনও কখনও আমারা কোন সুনেতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে গিয়ে বলে ফেলি- ওমোকের জনগণের পালস বোঝার ক্ষমতা ছিল বা আছে। জনগণের এই পালসই হলো তাদের গড়পড়তা মরাল, বুদ্ধিমত্তা, আর্থিক সামর্থ্য, আবেগ, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতার একটা পরিমাপক মাত্রা। এই মাত্রাকে শুধু বুঝতে পারাটাই নেতার কাজ নয়, সময়ের সাথে সাথে এই মাত্রাকে সামান্য হলেও বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও তার মধ্য থাকতে হবে। তবেই না সে সুনেতা বা হিরো। যে ভুরি ভুরি বই লিখে বাজার মাত করতে পারে সেই লেখক নয়- যে পাঠক তৈরি করে পাঠকের হাত ধরে লেখকের নিজস্ব উন্নত স্বপ্নের পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারে, সেই সুলেখক। যে বাজার মাৎ করার জন্যে নিজেই পাঠকের মত হয়ে, পাঠকের রঙে রঞ্জিত হয়, সে কুলেখক। একজন নেতার বেলায়ও সেই একই কথা প্রযোজ্য। যে নেতা জনগণকে অনুসরণ করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভ্রান্ত জনতার পিছু পিছু গড্ডালিকা-যাত্রার মধ্যদিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়, তাদের গড়পড়তা চরিত্রকে বাড়াতে কোন শ্রমই দেয় না, সে আসলে কুনেতা। সে ঐ জাতির চিহ্নিত শত্রু।

2 Comments

  1. http://www.youtube.com/watch?v=uKT3Zsycoes&list=UU9Rx6PqLzq6LocHrPLwmqIg&index=7

    বুধ, ২৯ মে, ২০১৯ তারিখে ৪:০৯ PM টায় এ উদয়ের পথে চলি একসাথে লিখেছেন:

    > নারী-উত্তরপুরুষ posted: ” লিখেছেন- শাখা নির্ভানা প্রকৃতির সবচেয়ে বড় একটা
    > গুণ হলো, চরম অবস্থা থেকে সে নিজেকে প্রয়োজনে একটা গড়পড়তা অবস্থায় নিয়ে আসতে
    > পারে। এই যেমন আমাদের এই আধাপরিচিত, আধাঅপরিচিত বিশ্বটা। সে সৃষ্টির শুরুতে
    > বৃহৎবিস্ফোরণের সময় যেমন চরমভাবাপন্ন ছিল আজকে সে আর তা নেই। ”
    >

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s