সহজ মানুষের রোজনামচা


roso

লিখেছেন- রওশনারা বেগম

অপারেশনের পর শারীরিক দুর্বলতা আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠছি। তীব্র ব্যথা নিরাময়ের জন্য একটা কড়া পেইন কিলার গত কয়েক দিন চালিয়ে বন্ধ করেছি। এই সবের অনেক সাইড ইফেক্ট রয়েছে। আমার মানসিক শক্তি দেখে ডাক্তার বেশ অবাক হয়েছে। হাসতে হাসতে অপারেশনে গিয়েছিলাম। জীবনটা হাসতে হাসতে শেষ করে দেবার একটা অন্য রকম আনন্দ রয়েছে। যাক সেই কথা।

আমি অতিসম্প্রতি পেইন্টিং চর্চা শুরু করেছি। সেখান থেকে একটা ধারণা হয়েছে যে, স্বাভাবিক সহজ সরল ভাবনায় যে শিল্প আসে তাই মুগ্ধকর। অনেক কিছু থাকা স্বত্তেও আমরা কেউ কেউ ভিখারীর মত আচরণ করি। অকারণে জীবনকে জটিল করে তুলি। সব সময় স্রোতের বিপরীতে যেতে হবে কেন? যে স্রোতটি আছে সহজ জীবন-বোধের অনুকূলে, তাকে সেইভাবে চলতে দিলে কী ক্ষতি? এতে যে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। এই প্রবাস জীবনে অনেকের অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। শুধু ডলারের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেকের সংসার জীবন তো একেবারেই নেই। পরিণতিতে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ ডিপ্রেশন।

একটা ছোট্ট ঘটনার কথা না বলে পারছি না। আমার এপার্ট্মেন্টের মেইন দরজা খুললেই অপর সাইডে আরেক বাঙালী পরিবারের বাস। আমি যখন নতুন এই বিল্ডিংয়ে আসি, উনাদের দেখে খুব খুশি। মাঝে মাঝে উনাদের সাথে বাংলায় কথা বলা যাবে। উনাদের কোন ছেলে মেয়ে নেই। নতুন আসার পর দুই একদিন কথা হয় করিডোরে দাড়িয়ে। এরপর উনাদের আর দেখা পাই না। ভদ্রমহিলা আমার বয়সী। আমি ভেবেছি উনারা হয় তো চলে গেছেন নতুন কোন জায়গায়। হঠাৎ একদিন দেখা হয় লবিতে। জিজ্ঞেস করি, ভাবী ব্যাপার কী, আপনাদের যে দেখি না? আসলে ভাবী আমরা দুজনেই দুই শিফটে দুটি করে চাকুরী করি, তাই দেখা হয় না। উনারা দুজনেই খুব ধার্মিক। ভদ্র মহিলার হাতে পায়ে সব সময় মোজা পরা থাকতো। যাক সে কথা। প্রায় ১৫-২০ দিন আগে ভদ্রলোক হঠাৎ করে প্রথম আমার বাসায় আসেন। এই দুই বছরে উনাদের কোন দেখা পেলাম না। তাই অবাক হলাম। কোন একটা ব্যাপার হবে নিশ্চয়। জানতে পারলাম উনারা চলে যাচ্ছেন। বাড়ি কিনেছেন। তাই বলতে এসেছেন। বড় বাড়ি কিনেছেন। অনেকগুলো রুম। উপরে উঠার খবর জানাতেও মানুষ লাগে। আমি বললাম আপনাদের তো ছেলেমেয়ে নেই, এখন একটা বাচ্চা দত্তক নিন। অন্যের বাচ্চাকে নিজের মনে করাটা অনেক বড় মনের পরিচয়। উনি এতে একটু বিরক্ত হলেন। ইসলামে এটিকে হালাল করা হয়নি। এটিকে নিসিদ্ধ করা হয়েছে। উনি আমাকে কোরান হাদিসের আলোকে সব বুঝিয়ে বললেন। টেস্ট টিউব বেবিও উনাদের কাছে হারাম। ম্যাকডোনালাসও হারাম। অনেক বাঁধা নিষেধ মেনে চলে উনারা এই কানাডাতে ২০ বছর আছেন বহু কষ্টে। এত বড় বাড়িতে আপনারা মাত্র দুজন কী ভাবে থাকবেন? উত্তরে উনি জানালেন, নীচে বেসমেন্টে ডেকেয়ার করবেন।  উপরে নিজেরা থাকবেন আর অন্য রুমগুলো ভাড়া দেবেন। শুনে খুব অবাক হলাম।

এই জীবনে একটা মানুষের কত টাকা লাগে? কাদের জন্য এই টাকার প্রয়োজন? প্রতিবেশির কোন খোঁজ খবর কোন দিনও রাখেন নি। এদিকে টাকার পিছনে ছুটতে ছুটতে জীবনটা একেবারেই অন্য রকম করে তুলেছেন। ধর্মের নানা বাঁধা নিষেধ তাদের এমন ভাবে বেঁধে ফেলেছে যে সেখান থেকেও মুক্তি হচ্ছে না। শুধু একমাত্র ডলার ইনকামের মধ্যেই উনাদের সব প্রশান্তি লুকিয়ে রয়েছে। এই জীবনটা অনেক ছোট সময়ের জন্যে। যে কোন সময়ে এর সমাপ্তি হবে। অন্যের জন্য কিছু করতে পারার মত আনন্দ অন্য আর কোন কিছুতে নেই। সৃজনশীল কাজ কী শুধু নিজের জন্য? তা নয়। অন্যের জন্য ভাবতে পারা, এই হৃদয়ে অন্যেকে যদি ধারণ না করতে পারি তা হলে এই মানব জন্মে কোন স্বার্থকতা থাকে না।

আমি যখন অপারেশন টেবিলে শুয়ে আছি তখন আমার একটাই কথা মনে হয়েছে, আমি এই জীবনের রূপ রস, গন্ধ অনেক কিছুই উপভোগ করেছি। যদি ফিরে আসি তাহলে আরও কিছু কাজ করবো। অপারেশনে যাওয়ার আগে আমি প্রথমে দশ হাজার ডলার ক্রেডিট কার্ডের লোন শোধ করি। এক পয়সা যেন কারও কাছে ঋণী না থাকি। প্রবাসে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারটা একেবারেই অন্যরকম। জীবন যতো সহজ সরল হবে ততোই জীবন উপভোগ্য হয়ে উঠবে। নানা নিয়ম কানুন দিয়ে একে বেঁধে ফেলে জটিল করার কোন মানে হয় না। মৃত্যর সময় এলে সেই মৃত্যুকে যেন সহজ ভাবে বরণ করে নিতে পারি এই যেন হয় প্রতিটি জীবনের ক্ষেত্রে। কোন ব্যথা, কোন মোহ, কোন মায়া যেন এই সহজ স্বাভাবিক প্রস্থানকে জটিল না করে তোলে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s