গণ-অপমানের কথকতা


khali

লিখেছেন- শাখা নির্ভানা

অপমান দুই রকমের হয়- ব্যক্তিগত অপমান ও গণ-অপমান। দুটো উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, সুলতান এসে রেগেমেগে কুদ্দুস সাহেবকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলে গালি দিলো। চোখও রাঙালো। কুদ্দুস সাহেবের সামনে দুটো পথ খোলা- এক, সুলতানের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া। দুই, শক্তি থাকা সত্তেও সুলতানকে ক্ষমা করে একটা মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। যিশু, গান্ধী প্রভৃতি মহামানবদের অনুসরণে কুদ্দুস সাহেব সুলতানকে ক্ষমাই করে দিলেন। মহান হওয়ার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি।

কিন্তু গণ-অপমান? সেটার প্রকৃতিইবা কেমন? রাষ্ট্র হচ্ছে জনগণের সাথে শাসকের পবিত্র চুক্তি। এই চুক্তির কিছু আছে মৌলিক, যা কোন ভাবে রাষ্ট্র লংঘন করতে পারে না। যদি সে তা লঙ্ঘন করে এবং দম্ভ ও ঔদ্ধত্ত দেখায়, তখন ঐ দেশের প্রতিটা মানুষ যা অনুভব করে, তার নাম গণ-অপমান। গণ-অপমান কতটা মারাত্মক? তা কি ক্ষমা করে দেয়া যায়? ব্যক্তিগত অপমানের মত তা কি চুপিচুপি হজম করা যায়?

আরও একটা উদাহরণ দেই। মনে করা যাক, এক কেজি গুড় ৫ থেকে ১০, ১০ থেকে ২০ জনকে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকের ভাগে গুড়ের পরিমান কমতে থাকে। ষোল কোটি মানুষের ভিতরে তা ভাগ করে দিতে হলে কারও ভাগে গুড় নামে কোন বস্তুই মিলবে না। ব্যক্তিগত অপমান অনেকটা এমন। অনেকের সাথে শেয়ার করতে করতে, ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা করে দেয়ার ভিতর দিয়ে তা এক সময় বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু গণ-অপমান ঠিক এর উল্টাটা। এই অপমান বিলিয়ন মানুষের ভিতরে ভাগ হয়ে গেলেও তা কারও ভাগে এতটুকু কম পড়ে না। ব্যক্তিগত অপমান ২, ৩ বা ৪ এর মধ্যে জানাজনি হয়। গণ-অপমান সারা বিশ্বের দৃষ্টিগোচর হয়।

বহুবিধ কারণে গণ-অপমান ক্ষমার যোগ্য নয়। সবাই মিলে বা গণমানুষ মিলে এই অপমানের সুরাহা করা লাগে। অপমান বোধের তীব্রতা দেহে ও মনে জাগা লাগে। কোন মহান জাতির একটা উল্লেখযোগ্য গুণ হচ্ছে, ব্যক্তিগত অপমানের চেয়ে গণ-অপমান তাদের তীব্রভাবে অপমানিত করে, নাড়া দেয়। ঐ জাতির আত্মার উপস্থিতি এর ভিতর দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়ে। একবারও পরীক্ষা করে দেখেছেন কি গণ-অপমান আপনাকে কতটা অপমানিত করে? যদি অপমানিত না করে তবে বুঝবেন, আপনার ভিতরে আত্মা নেই।

তারপর কি? তীব্রতর অপমানে বিক্ষত মানুষ কী করবে তারপর? তারা এক হবে। তারা সিদ্ধান্ত নেবে কোন পথে, কি উপায়ে এই অপমানের সুরাহা করা যায়। বদলা নেয়া যায়। র‍্যাশানাল কনশাসনেস বা যুক্তিবাদী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে তারা কর্মপন্থা ঠিক করবে। এই চেতনাটা মানুষ ভিন্ন অন্য কোন প্রাণীর ভিতরে নেই। বস্তুর ভিতরে থাকার তো কোন প্রশ্নই উঠে না। এই চেতনা যদি না থাকে তবে আপনি গণ-অপমানের তীব্রতাটা অনুভব করতে পারবেন না। মনে হবে এটা আমার অপমান নয়। আমি ধনে-জনে-আহার-বিহারে উত্তম আছি। রাষ্ট্র আমার প্রতি সুপ্রসন্ন। এই যুক্তিসিদ্ধ চেতনা আপনার বহুমুখী চেতনার একটা অংশ মাত্র। গণ-অপমান অনুভব করার জন্যে এই চেতনার কোন বিকল্প নেই। অসম্পূর্ণ আত্মা আসলে কোন আত্মাই নয়। সেই কারণে এই চেতনার অভাবে আপনি আত্মাহীন জন্তু বা জড়ে পরিণত হবেন, তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। যখন গণ-অপমানের তীব্রতা যুক্তিঋদ্ধ চেতনার ভিতর দিয়ে আপনাকে হুশে নিয়ে আসবে, আবেগ ও বুদ্ধিমত্তার কাছে আপনাকে সমর্পণ করবে, তখন এক হয়ে অপমানের সুরাহা করার কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে আপনি আর কারো আহবানের অপেক্ষা করবেন না। তাই আরও একবার পরীক্ষা করে দেখুন আপনার ভিতরে র‍্যাশনাল কনশাসনেস আছে কিনা! গণ-অপমান বুঝার উপযোগী সেন্সর আছে কিনা! আত্মা আছে কিনা! 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s