কথা শুধু কথা নয়


khali

লিখেছেন- শাখা নির্ভানা

একসময় গ্রেট ব্রিটেনের প্রজ্ঞাবান মানুষেরা ধারণা পোষণ করতো, সর্বোচ্চ আসনে যে বসবে, মানে প্রধানমন্ত্রী যে হবে, তার ব্যপারে দুটি প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হতে হবে। এক- হু ইউ আর? দুই- হোয়াট ইউ আর? হু ইউ আর হলো তোমার পারিবারিক ও গোষ্ঠিগত পরিচয় ও সংস্কৃতি। সেটা অনেকটা পেশার বাইরে নিজের চিন্তা, চেতনা, হবির প্রামান্য নিদর্শন। তার মানে, তোমার অস্তিত্বের আলোকিত অংশটা দেখতে কেমন তা। অন্যদিকে হোয়াট ইউ আর হলো, তোমার একাডেমিক যোগ্যতা। তোমার পেশা। তোমার অর্থবিত্ত ইত্যাদি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে আগে মনে করতাম, দারিদ্র মানুষকে উন্নত করে, বা দারিদ্রের ভিতর দিয়ে উন্নত হওয়া যায়। আমার ধারণাটা অসম্ভব রকমের ভুল ছিল। ভলাণ্টারি পভার্টি বা স্বেচ্ছাদারিদ্র হয়তো আত্মউন্নয়নে কাজে লাগে, কিন্তু বংশানুক্রমিক দারিদ্র মানুষকে হীনমন্য করে, অধঃপতিত করে। এই কারণে পিএমের পারিবারি অর্থগত সচ্ছলতা ও স্বচ্ছতাকে তারা শিক্ষার মতনই সমান গুরুত্ব সহকারে দেখতো। একাডেমিক শিক্ষা মানুষ গ্রহন করে পেশার কারণে, পেট বাঁচাতে। কিন্তু যে শিক্ষা সারা জীবনের, যে শিক্ষা ক্ষুধা নিবৃত্তির দিকে তাকিয়ে করা লাগে না, সেই শিক্ষাটা স্বতঃস্ফূর্ত, বহুমাত্রীক ও অনেক বড়।

এই প্রসঙ্গে কনফুসিয়াসের সেই বহুল পরিচিত আধাগ্লাস চায়ের গল্পটা না বলে পারছি না। কনফুসিয়াস তার ছাত্রদের অর্ধেক ভরা চায়ের গ্লাস দেখিয়ে বলেছিলেন- তোমরা গ্লাসের যে অংশটা খালি দেখছ ওটা আসলে খালি নয়। নিচের অর্ধেকে চা আছে সত্য, কিন্তু খালি অংশের সাথে যোগাযোগ রয়েছে মাহাশূন্যের বা মহাবিশ্বের। এখন তোমরা বলো, কোনটা বড়, খালি অংশ, নাকি ভরা অংশ? সবাই বললো- খালি অংশ। মহাশিক্ষক বললেন- ঠিক তাই। মানুষের জীবনের নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত জ্ঞানের সাথে তুলানা করা যায় গ্লাসের এই খালি অংশটাকে, যে অংশের চর্চা চলে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত। এই কারণে প্রজ্ঞাবান ব্রাইটনেরা মনে করতো, গ্লাসের এই খালি অংশের জ্ঞান তাদের মাথার উপরে যে প্রধানমন্ত্রী বসবে অন্ততঃ তার তা কিছুটা থাকতে হবে।

যে একটা জাতির নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে সর্বোচ্চ আসনে বসতে চায় তার একাডেমিক পেশাগত শিক্ষা, এক্সট্রা-কারিকুলার আলোকিত শিক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছলতা ও স্বচ্ছতা এবং পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, এতকিছুর একটা ভারসাম্যপূর্ণ সমন্নয় থাকাটা একান্ত বাঞ্ছনীয়। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতরে থেকে দেশ চালাতে গেলে এইসব বৈশিষ্ট থাকাটা ভীষণ জরুরী। ব্রিটেনের সাবেক এলিটদের এই ধারণাতে আমি এখনও বিশ্বাস করি। কী হবে এইসব গুণপনা যদি না থাকে? এসব যদি মাথার উপরে বসে থাকা ব্যক্তিটার ভিতরে না থাকে তবে তার ঐ গুণশূন্যতার ছাপ পড়বে রাষ্ট্রের সর্ব ক্ষেত্রে। প্রজাদের শ্বাস-প্রশ্বাস চলে যাবে নাভীতে।

আরব্য উপন্যাসকে অনেকে সুফি সাহিত্য বলে, আমিও। মানুষের চরিত্রের এমন সুক্ষ্ণ ও ফলিত প্রদর্শন আর কোন সাহিত্যে সেইভাবে এসছে কিনা আমার জানা নেই। আবুল হোসেন আর খলিফা হারুনার রশীদের কাহিনী থেকে আমরা একদিনের খলিফা আবুল হোসেনের বিশেষ ঐ গুণশূন্যতার নিদর্শন পাই। অথবা ধরা যাক, কোন কারণে সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’র নায়ক কোন উপায়ে দেশের সর্বচ্চ আসনে বসে গেল। কী হবে তখন! বরুণা মেয়েটার কিংবা ঐ সুবর্ণ কংকন পরা ফর্সা রমনীদের অবস্থা যে কী হবে ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়। এসবই বিবেচনায় আনার মতন বিষয়। মোটেই এসব সামান্তবাদের বিষয় নয়। যতদিন আমরা এইসব বিষয়ের উপলোব্ধি নিজেদের ভিতরে না জাগাতে পারবো, ততোদিন আমদের ভাগ্যে আবুল হোসেন ছাড়া আর কিছুই জুটবে না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s