বাঙালীর ধর্ম ও রাষ্ট্র


BelalB

লিখেছেন- বেলাল বেগ

ভাবপ্রবন বাঙালির বঙ্গবন্ধুর কন্যা, বাংলাদেশের এ যাবৎকালের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মকে কোথায় রাখবেন এখনও মনস্থির করতে পারছেন না এমন কি জনগনকেও স্থির করতে দিচ্ছেন না কারণ তিনি ধর্ম নিয়ে কোন কথা বলা পছন্দ করেন না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে উগ্রধর্মবাদীদের প্রধান নেতা শফি হুজুর একজন মহিলাকে প্রধান মন্ত্রী, স্পিকার হওয়া ত দূরের কথা, তাঁদের ঘরের বাহির হওয়াটাই পছন্দ করেন না কারণ তাঁর ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী তাঁরা শুধু ‘তেঁতুল’ যা তাঁর লালা ঝরায়। এ জঘন্য রুচিহীন বাক্যটি লিখতে গিয়ে আমারই বমনেচ্ছা হয়েছিল কিন্ত লিখতে হয়েছে যেমন অতীতে বেওয়ারিশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আমাকে দুইবার জলোচছ্বাসে মৃত পঁচা শিশুদের লাশ একাই মাটি চাপা দিতে হয়েছিল নাক বন্ধ না করেই। কতগুলি আরবী কিতাব মুখস্থ করা বদ্ধচিন্তার অবিকশিত মনের অশিক্ষিত এক ইন্দ্রিয়-তাড়িত বৃদ্ধ যখন যা ইচ্ছা বলে সেরে যেতে পারে, আমি কেন বলতে পারব না সভ্যতার সত্য কথাগুলি? 
‘ধর্ম অশিক্ষিত লোকের শিক্ষা আর শিক্ষাই শিক্ষিত মানুষের ধর্ম’ আমাদের এক মনীষীর এ কথাটির মাধ্যমে জলের ধর্ম, আগুনের ধর্ম, লোহার ধর্ম, পশুপাখির ধর্মের মত মানুষের ধর্মও পরিস্কার করে বুঝানো হয়েছে। এটি জানা, আলোচনা করা, প্রকাশ করার মধ্যে অপরাধ কোথায় আমি বুঝি না। কিন্তু বুঝি যে মানুষটি ধর্মের নামে নরহত্যা করে আনন্দ পায়, সে মানুষটি মানুষ থাকার যোগ্যতা হারিয়েছে। সে অশিক্ষিত মানুষটি জানলই না ‘মানুষ’ কি। মানুষ যে আসলে পঞ্চইন্দ্রিয় ও ষড়রিপুর একটি প্রানী যে বুদ্ধিমত্তার সাথে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে রিপুগুলিকে নিয়ন্ত্রিত রেখে নিজকে সমাজে বসবাসযোগ্য রাখে এ অত্যাবশ্যক খবরটাই ঐ ধর্মান্ধ পশুটির কাছে অজানা রয়ে গেল। তার কানে এয়াকুব আলী চৌধুরীর অবিস্মরনীয় বাক্যটি কখনই ঢোকেনি, “পুষ্পের যা সুরভী, পল্লবের যা শ্যামলিমা, দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের যা নীলিমা, ইসলাম মানবাত্মার তাহাই”।

ইতিহাসে এম এ এবং শিক্ষন বিদ্যায় বিএড, এমএড পড়া এই লেখকও পন্ডিৎ লতিফ সিদ্দীকির মত ধর্ম অনিসন্ধিৎসু। দলীয় মানুষ হিসাবে তাঁকে ভাসানী-খামুস শুনতে হয়েছে কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আইনানুগভাবে এটা আমি আমার জন্যে আশা করি না। আমার দেশবাসী এবং আমাকে এ ঔদ্ধত্যের শিক্ষা দিয়ে গেছেন যিনি তিনিই বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব, সাহস এবং অপারেজয় আত্মসন্মানকে আমাদের হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলেই ত নজরুলের ভাষায় “আমি আমারে চিনেছি আজিকে, আমার ভাঙ্গিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”। এই আত্মসন্মানের তাকিদ থেকে কারও প্রতি উষ্মা না রেখে বাংলাদেশে ধর্মের অবস্থান ও ভূমিকা এবং তার সংগে আমাদের রাষ্ট্রের সম্পর্ক সম্বন্ধে আমার কিছু ধ্যানধারণা জনসমক্ষে জনকল্যাণে উপস্থাপনের সৎসাহস দেখাচ্ছি। 
ভারতবর্ষের প্রাচীন কালের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি প্রধানতঃ দ্রাবীড় মানবগোষ্ঠির বংশধর হলেও বঙ সহ নানান জাতি ও নৃগোষ্ঠির মিশ্রনে আমরা কালক্রমে আধুনিক বাঙালি জাতিতে পরিণত হয়েছি। আমাদের এ বিকাশে প্রকৃতি পূজাসহ হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ইসলাম ধর্মের প্রভাব কাজ করলেও, বাঙালি পরিচয়ে কোন অসুবিধা হয়নি। আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ চৈতন্যের সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটিয়েছেন আমাদের এক মধ্যযুগীয় কবি, চন্ডীদাস। তিনি ঘোষণা করেছেন “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”। চন্ডীদাস বৌদ্ধদের ইশ্বরহীন মানব অস্তিত্বের সত্যতা উপলব্ধী করেছিলেন এবং জ্ঞানের মাধ্যমে মানব জীবন যাপনের বৌদ্ধ সূত্রগুলির গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। আজকে আমরা বিশ্বসভ্যতার বস্তুগত ও জ্ঞানগত অবিশ্বাস্য উন্নতি দেখে উপলব্ধী করি এসব কোন ইশ্বর বা বিধাতা করেন নি করেছে মানুষই তার আপন শক্তি দিয়ে। আমরা আজ বড় অহঙ্কার করে বলতে পারি পৃথিবীর সকল জাতির আগে এমন কি আজকের বিশ্বের এক নম্বর দেশ আমেরিকার আবিস্কার এবং জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাসহ বিশ্বব্যাপী গনতন্ত্র বিস্তৃত হবার বহু আগে, মানব জাতিকে আমরাই মানাধিকারের বানী শুনিয়েছি। বাঙালির বিশ্বমানবতাবোধের এ উপলব্দী আগাগোড়াই বাঙলা সাহিত্যের মূলবিষয় হিসাবে রয়ে গেছে যা রবীন্দ্রনাথে এসে নোবেল পুরস্কারে স্বীকৃত ও সন্মানিত হয়েছে।

এটা ঠিক, আধুনিক কালে রবীন্দ্রনাথই আমাদের বিশ্বপরিচয় এনে দিয়েছেন। কিন্তু কেউ খেয়াল করেনা যে প্রাচীন বাংলার সভ্যতা ও সমৃদ্ধির খবর অনেক শতাব্দী আগে থেকেই বিশ্বে চাউর ছিল। রবীন্দ্রনাথের পারিপার্শ্বিকতার সুযোগ কাজী নজরুল ইসলাম পেলে ইংরেজ কবি বায়রনের সংগে বিশ্বসাহিত্যে তাঁর খ্যাতিও জ্বলজ্বল করত। নজরুলের অমর কাব্য বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ইংরেজিতে অনূদিত হলে, তিনিও হয় ত নোবেল পুরস্কার পেতেন। এ প্রসঙ্গের অবতারণার উদ্দেশ্য পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে আমাদের প্রধান কবিরাও আমাদের ধর্ম্ নিরপেক্ষ জীবনাদর্শকে উচ্চে তুলে ধরেছেন। 
আমাদের হাজার বছরের মানবতাবাদী সংস্কৃতির আলোকে আজকের বাঙালিদের অধিকাংশের চরিত্রে ধর্মের এ দাপাদাপি এমন কি এগুলির অস্তিত্বও থাকার কথা ছিল না। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনবোধ আজ ধর্মের আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ভারতে অধিষ্টিত হয়েছে হিন্দুত্ববাদী সরকার, পাকিস্তানের পরিচয় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র আর বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে ‘রাষট্রধর্ম ইসলাম। ত্রিধা বিভক্ত ভারতবর্ষের আজকের এ ধর্মান্ধ পরিণাম আসলে মেকলে নামক একজন বৃটিশ পন্ডিত ও রাজনীতিকের আবিস্কৃত মানবতানাশক বিষেরই বিলম্বিত ভয়ানক প্রতিক্রিয়া। ভারতীয়দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট পর্যবেক্ষন করে মেকলে অনুধাবন করেছিলেন যে ভারতবাসীরা ধর্মকেই জীবনের প্রকৃত অবলম্বন হিসাবে মানে। এই মান্যতাকে রক্তচক্ষু কিংবা ধূর্ততা দিয়ে রাজ বন্দনায় রূপান্তরিত করেছিল ভারতবর্ষের রাজা-বাদশারা। মেকলে বৃটিশ কতৃপক্ষকে পরামর্শ দিলেন ভারতবর্ষের প্রধান ধর্মালম্বীদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধর্মীয় বিবাদ ও হানাহানিতে লিপ্ত রাখতে হবে। ইতিহাস প্রমান দিয়েছে বৃটিশের এই ‘ডিভাইড ও রুল’ ষড়যন্ত্র কার্যকর করে সংখ্যায় নগন্য হয়েও বৃটিশ প্রায় দুইশ বছর ভারতবর্ষ দখলে রেখে শোষণ ও লুন্ঠন চালিয়ে গেছে। এমন কি তারা ভারতকে বিভক্ত করে স্বাধীনতা দেবার নীতির মধ্যেও ধর্ম-বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিল যাতে অপার সম্ভাবনার এই উপমহাদেশ অহর্নিশ সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে নিমজ্জিত থাকে।

মেকলিয়ান বিষমিশ্রিত স্বাধীন মুসলমান রাষ্ট্রের পূর্বাংশের পূর্বপাকিস্তান নাম যেন বাঙালিদের জন্যে একটি বেমানান এবং অশ্বস্তিকর পোশাক হয়ে গেল। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে গর্বিত বাঙালি নেতৃবৃন্দ ও পন্ডিত জনেরা কাগমারিতে প্রথম জাতীয় সন্মেলন ডেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রনয়ন করতে চাইলেন। সেখানেই মওলানা ভাসানী আওয়ামি মুসলিম লীগ গঠন করে মুসলিম লীগের ধর্মধাপ্পার রাজনীতি থেকে সরে, জনতার কাতারে আসার উদ্যোগ গ্রহন করেছিলেন। বাঙালিদের জাতিগত এই রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার আরেক ধাপে এল আওয়ামি মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটিরই দুঃসাহসিক মূলোৎপাটন। এই স্যেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামি লীগই বাংলাদেশে বাঙালি জাতির একমাত্র আশা ভরসার কেন্দ্র হয়ে গেল। তারপর ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু এই আওয়ামি ঐক্যের শক্তিতেই সমগ্র বাঙালি জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ করান। পাকিস্তানী দুশমনেরা বঙ্গবন্ধুকে গেরফতার করে ঢাকায় গনহত্যা চালানো মাত্রই আওয়ামি লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনগন এবং স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। আওয়ামি লীগ তখনও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল বলে, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাই বাঙালি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।

আমাদের আজকের জনগনকে বিশেষ করে রাজনীতিকদের বুঝতে হবে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন ছিল স্বাধিকার ও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় মুক্তি অর্জন। পাকিস্তানের সরকার বিশেষ করে সেনাবাহিনী রাজনীতির ওই মহান লক্ষ্যগুলি সম্বন্ধে নিম্নতম ধারণাও যদি রাখত, বাঙালিরা নিজেদের স্বর্বস্ব ত্যাগ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যাবার প্রয়োজন বোধ করত না কারণ পাকিস্তান অর্জনে প্রধান ভূমিকা তাদেরই ছিল। 
১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ নিদ্রিত ঢাকা নগরীতে ট্যাংক নামিয়ে গনহত্যা চালিয়ে এক রাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী দশ হাজার মানুষ হত্যা করে। গ্রেনেড, মেশিন গানের গুলি, বেয়নেটে ঝরা রক্তশ্রোতে বলা চলে, সে রাতেই ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে ভেসে গেছে। এরই সংগে প্রমানিত হয়েছে যে রাষ্ট্র ও ধর্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠান হিসাবে ভিন্ন এবং বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস নিয়েও বাঙালি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাই মিলে একই রাষ্ট্রে একই জাতি। এই উপলব্ধি থেকে ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে মৌলিক চার রাষ্ট্রনীতি হিসাবে এসেছে সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র, ও সমাজতন্ত্র। এ যেন বাঙালির জীবনদর্শন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ সুপ্রতিষ্ঠার ও অনুসরণের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা । 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সপরিবার হত্যা এবং জেলখানার কঠিন নিরাপত্তায় তাঁর শ্রেষ্ঠ চারজন সহকর্মীকে হত্যা করে স্বাধীনতার শত্রুরা আমাদের সে মহতী স্বপ্নগুলিকে অর্থহীন করে দিয়েছিল। অতঃপর শ্ত্রুরা নানা ছদ্মবেশে জনগনের বন্ধু সেজে গোপনে বাংলাদেশকে আবার ধর্মধাপ্পার দেশ বানিয়ে ফেলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লা’ এবং রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ঢুকিয়ে। এ কাজটি করার তারা সাহস পেয়েছিল এ কারণেই যে জনগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন ছিল অশিক্ষিত যারা ধর্মকেই ইহকাল এবং পরকালের একমাত্র অবম্বন মনে করত। জনগনের এ দশাকে সম্বল করে গজিয়ে উঠেছিল একটি বিরাট মোল্লা-মৌলভী শ্রেনী যারা বৃটিশের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতির অধীনে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা শিক্ষাকেই প্রকৃত শিক্ষা মনে করত এবং তার মাধ্যমে গরীব মুসলমানদের ইসলামি বিপ্লবের জন্যে তৈরি করার স্বপ্ন দেখত। 
গত ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এলে জনগনের বুকে আশার ঝড় উঠে। জনগনের আশা ছিল ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গৃহীত বাঙালির অনাদী থেকে আবহমান কালের জীবনাদর্শ আবার সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তা এখনও হয়নি। না হবার কারণও আমরা জানি। বিশ্বাসঘাতক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ছিল পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা। তারই প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় বংগবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ চার নেতা নিহত হলে, সুযোগ বুঝে জিয়া নিজেই ক্ষমতা গ্রহন করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবাদর্শে ফিরিয়ে নিতে তৎপর হয়। সেজন্যে তিনি প্রথমে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে আটক ও বিচারাধীন সকল জামাতকর্মী, রাজাকার, আলবদর কে জেল থেকে মুক্তি দেন। জিয়া স্বাধীনতার শত্রু হিসাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাতে ইসলামি এবং তার সভাপতি গোলাম আযমকে বাংলাদেশে শুধু পুনঃপ্রতিষ্ঠিতই করেন নি, তাদের সুরক্ষা দেবার জন্যে বিএনপি নামে একটি রাজনৈতিক দলও বানিয়ে ফেলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আরেক প্রাক্তন গোয়েন্দা জিয়াকে কেন হত্যা করে নিজেই ক্ষমতা দখল করেছেন এবং কেন সুদীর্ঘ নয় বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশ ইতিহাসের সে অধ্যায়টি আজও স্পষ্ট নয়। তবে এই দুই সামরিক জান্তার শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় বিএনপি জামাত কেবল শক্তিশালীই হল না, তাদেরই গোপন সহায়তায় বাংলাদেশে গড়ে ওঠে সসস্ত্র ইসলামি জঙ্গি বাহিনী। 

বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান অথবা ধর্মভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র বানানোর কৌশল হিসাবে বিএনপি মন্ত্রিত্ব দিয়ে বাংলাদেশের শত্রু জামাতকে শক্তিশালী হবার সুযোগ করে দেয়। একই সংগে রাজনোইতিক হত্যা ও সারাদেশে সমন্বীত বোমা বিস্ফোরণের চমক দেখিয়ে সসস্ত্র জামাতে ইসলামি জঙ্গিরাও নিজেদের ভয়ঙ্কর শক্তির জানান দেয়। দেশ এখন স্পষ্টতঃ দ্বিধা বিভক্ত। এক পক্ষ সম্পূর্ণ পরাজিত এবং হতবল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনই স্থিতিশীল হবে না। 

শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনকাল দেশের জন্য অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে এসেছে। শিক্ষা খাতেও একটা জাগরণের লক্ষন দেখা যাচ্ছিল। তারপরেই হুট করে ইসলামি জঙ্গীদের মুক্তমনা বাঙালি হত্যার একটা মরশুম শুরু হয়ে হল। প্রত্যাশা মতই তাদের পেছন থেকে মদদ জুগিয়ে চলেছে বিএনপি এবং জামাত শত্রুজোট। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে শেখ হাসিনার ক্ষমতা কোন কারণে হতবল হলে স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা বাঙালি জনগোষ্ঠীরই জীবনাবসানের আশংকা দেখা দেবে। এ অবস্থান থেকে পরিত্রাণ দেবে কে? 

দূর্নীতি ও সন্ত্রাসের ভয়াভহ কলঙ্কযুক্ত আজকের আওয়ামি লীগের জনপ্রিয়তায় জোর ভাটির টান পড়েছে। ওদিকে ইসলামি জঙ্গীদের হাতে চলছে অবিরাম নরহত্যার অকল্পনীয় নৃশংসতা। এ অবস্থায় যদি কোনক্রমে আওয়ামি সরকারের পতন ঘটে দেশে যে আইয়ামে জাহেলিয়াত নেমে আসবে তা ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়।

আপন মনে ভাবি, আমাদের এ সরকারের রক্তক্ষয়ী উচ্ছেদের আশংকা একটি হতাশগ্রস্ত দুঃস্বপ্ন মাত্র। মন বলে তাই হোক, এমন সময় ঘটে যায় স্বাধীনতার স্বপ্নাতুর আরেকজন যুবকের গলাকাটা মৃত্যু, একজন নারী নাট্যকর্মীর ধর্ষনোত্তর হত্যা। মৃত্যুর পর মৃত্যু দেখে দেখে এখন সন্দেহ হয় বাঙালির শত্রুরা মৃত্যুর আসল হোলি খেলা দেখার জন্যে নিরীহ মানুষদের মানসিক প্রস্তুতি ঘটাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে ৩০ লক্ষ মানুষের প্রান এবং দুলক্ষ ধর্ষিতার আহাজারির বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ? নিজকে এককভাবে সকল প্রশ্নের উত্তরদাতায় উত্তরণ ঘটিয়েছেন বলে আমার এ প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছ থেকেই চাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এখানে সবিনয়ে আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মাঝে আপনিই প্রথম আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘প্রতিষ্ঠান’ সমূহ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু সকল সিদ্ধান্তের জন্যে জনগন ও সরকার কেবল মাত্র আপনারই মুখাপেক্ষী থাকে এ পর্যবেক্ষন প্রমান করে আপনার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কার্যকর হয়নি বা ওটা আপনি চালু করেন নি। ফলে দেশের সমস্ত ভাল ও মন্দ কাজের জন্য আঙুল দেখিয়ে জনগন আপনাকেই দায়ী করে। আপনার বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ উঠে আপনি জামাত-বিএনপি নিষিদ্ধ করতে চান না, আপনি ইসলামি জঙ্গিবাদ উচ্ছেদ করতে চান না, আপনি দেশটার ধর্মনিরপেক্ষতা উচ্ছেদ করতে চান, হিন্দু উচ্ছেদে আপনার আপত্তি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশের অকল্পনীয় অগ্রযাত্রায় আপনি যে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন, সে প্রেক্ষিতে এ সব অভিযোগ থাকা মানে প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা। এর ফলে জনগন, সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে সব সময় একটা ধোঁয়াসা থেকে যাচ্ছে। এরই সুযোগ নিচ্ছে স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের শত্রুগন।

স্বাধীন বাংলাদেশে জামাত-বিএনপির অস্ত্বিত্ব বেআইনী। মুক্তিযুদ্ধের এ শত্রুদের বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোন অবকাশ নেই। তাদের টিকে থাকা মেনে নেয়া মানেই ত মুক্তিযুদ্ধ পরাজিত। তারা টিকে থাকা মানেই ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। অতএব আর দেরী নয়, জামাত বিএনপি নিষিদ্ধ হোক; ১৯৭২ সনের সংবিধান সগৌরবে ফিরে আসুক।

1 Comment

  1. এগুকো তথাকথিত মন্তব্য হয়ে গেলো না? স্বাধীনতা বিরোধীদের দমন করা মানো তো ধর্মকে দমন করা নয়। যদি এদেশে মিটে দিল্লি, মস্কো, ওয়াশিংটনের স্বাদ তবে মক্কার জ্যোতি মুহাম্মদের ইসলাম কেনো বাদ?

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s