ফিল্ম সমালোচনা- গহীন বালুচর


nadera

লিখেছেন- নাদেরা সুলতানা নদী

 

অনুভূতি জানতে চেয়েছেন অনেকেই, আমি একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে একটু ব্যাক্ত করার তাগিদ অনুভব করছি। সিনেমা নিয়ে কিছু বলার আগে, অন্যকিছু প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট বলে নেই। কলেজ জীবনের পর থেকেই বাংলাদেশে সিনেমা হলে যেয়ে ওভাবে আর সিনেমা দেখা হয়ে উঠতো না। বদলে গিয়েছিলো জীবন ধারা, বদলে গিয়েছিলো সিনেমা ধারা।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছি ২০০৯ থেকে। এখানে আসার পরই জানলাম সিনেমায় যাওয়াটা শুধু একটা সিনেমাকে উপভোগ করা না, পুরোটাই একটা আনন্দ সময়। প্রথম প্রথম নিজের ছেলের জন্যে হলিওডি বিশেষ করে এনিমেশন সিনেমা দেখতে যেতাম। হলে বসে আলাদা একটা ফিল পাওয়া যায়। ছেলের খুশী দেখে নিজেও মন ভরাতাম।

এখানেও হিন্দি সিনেমা আসা শুরু করলো। হলিউডের সিনেমা দেখতে যেয়ে দেখতাম (এখানে সিনেমা হলগুলো কাছাকাছি) হিন্দি সিনেমা দেখে অনেক বেশী ভারতীয়দের সাথে আমাদের বিপুল পরিমাণে বাংলাদেশী দর্শক, থাকতো ভিনদেশী মানুষজনও!

আমি হিন্দি সিনেমা লাভার নই, আমীর খানের সিনেমা ছাড়া অন্য কারো সিনেমা দেখার সময়ই করা হয়ে উঠেনা। তারপরও বেঁছে বেঁছে দারুণ কিছু সিনেমা দেখি, মুগ্ধ হই। আর অপেক্ষায় থাকি, ইস একদিন আমরাও…।

অস্ট্রেলিয়াতে শুরু হলো বাংলা সিনেমা আসা। যতদুর মনে পড়ে আমি যে শহরে ছিলাম, সেখানে প্রথম বাংলা সিনেমা এলো ‘মনপুরা’। আমার মনে আছে সেই প্রথম ছোট একটা শহরে একটা বেলা বাংলাদেশীদের মিলনমেলা একটা প্রেক্ষাগৃহে। দুর্দান্ত একটা বিষয়, সিনেমা শেষ করে আমার ছোট্ট বাসায় বসেছিলো ভীষণ এক আনন্দ আড্ডা সেদিন, মনে রাখার মত।

এই প্রেক্ষাপট কেন বললাম, আমি ব্যাক্তিগতভাবে চাই, বাংলাদেশ পুরো বিশ্বে কিছু নেতিবাচক পরিচয়ের পাশাপাশি তুলে ধরুক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, উৎসব, আচার, সম্প্রীতির সুন্দর ধারা। আর এই ধারা তুলে ধরার জন্যে সিনেমা সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমের একটি।

অস্ট্রেলিয়াতে যখনই বাংলাদেশের কোন শিল্পী আসেন বা কোন বাংলা সিনেমা, আমি খুব চেষ্টা করি সেখানে ২০/৩০ ডলার দিয়ে আমার সাপোর্টটুকু পৌঁছে দিতে অন্তত। মূলত চাই, এই শিল্পমাধ্যমে থাকা মানুষদের বলতে ‘আপনারা আমাদের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যান, আপনাদের ভালোবাসার সবটুকু উজাড় করে ঢেলে দিন’। আপনারা সুস্থ সুন্দর কিছু ছড়িয়ে দিন, আমরা প্রাণভরে তা উপভোগ করি, আমাদের খারাপ সময়ে যেন কোন না কোনভাবে বলতে পারি, এই যে দেখ আমাদেরও আছে কিছু না কিছু…।

এবার বলি ‘গহীন বালুচর’ নিয়ে … আজকাল যা হয়, ফেসবুকের বদৌলতে সবকিছুর রিভিউ আগেভাগেই আমরা জেনে যাই। আমার কাছের সুত্র ধরেও তাই হয়েছে, একটা আগাম ধারণা নিয়েই সিনেমা হলে গেছি। গল্প বা অন্য কোথাও একটা গড়বর যে আছে সেটা মাথায় ছিলোই।

সরকারী অনুদান নিয়ে সৌদের বানানো, আছে বেশ গুণী অনেক শিল্পী আমার আশা ছিলো, না সবাই যেমন করে বলছে তার বাইরে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু আছে… সেটাই দেখি পাই কিনা।

শুরু থেকে শেষ… এই অপেক্ষাটা ছিলো। আমি এমন একজন দর্শক প্রবাস জীবনে বসে বড় পর্দায় বাংলাদেশ দেখছি তাতেই ভিতর ভিতর ভীষণ করে ভিজে যাই। সেখানে এই সিনেমার বিশাল নদী, চর, বালি, সবুজ, কাদা মাঠ যে আমাকে একটু বেশীই ছুঁয়ে যাবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা… এই সিনেমার লোকেশনও তাই!!!

ভীষণ রঙিন সব শাড়ী পড়া নায়িকা… আঁচলকে আকাশে বাতাসের উড়িয়ে চলা… সুন্দর!!! গানের গায়ক গায়িকা নির্বাচন ভালো হয়নি, এক দুইটা ছাড়া…

নুতন বেশ কজন ছেলে মেয়ে, যাদের দুই জনকে আমি এই প্রথম দেখলাম। পারুল এবং মিজান চরিত্র যারা করেছে। পারুল বেশ মিষ্টি একটা মেয়ে, কিন্তু মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিলো লেয়ার কাট কালারড চুল সুন্দর করে কথা বলা কোথায় যেন বেমানান লাগছে… একটু কি অন্যরকম হতে পারতো!

মিজান চরিত্র দুই একটা জায়গায় খুব ভালো অভিনয় করেছে। মনে গেঁথেছে…

মুল নায়ক সুজন এবং আরেক নায়িকা নিশির চরিত্র বেশ সাবলীল… সুজনের কথা বলার ধরনটা কি স্বাভাবিক কিনা সেটাও একটা ছোট্ট প্রশ্ন। নিশির চরিত্রে কাজ করা মেয়েটাকে নিয়ে সামনে আরো অনেক ভালো কাজ হতেই পারে… পর্দায় বেশ মনকাড়া লেগেছে ওকে।

অন্য চেনা মুখ, বাবু, আফরোজা বানু, জর্জ, রুনা খান, শাহানা সুমি এবং জিতু তাঁদের নামের সুবিচার করেছেন… সুবর্না মুস্তাফা এবং রাইসুল ইসলাম আসাদ… আমি আসলে ধরতে পারছিনা তাঁদের অভিনয় কি অন্যমাত্রার বলেই এমন লেগেছে? নাকি তাঁদের উচ্চমাত্রার অভিনয় দেখে আমরা অভ্যস্ত নই বলেই এমন এটা আমি বুঝতে পারছিনা!!!

সিনেমার শুরুতেই যেমন বলে নেয়া হয়, গল্প কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে মিল নেই… তাই গল্প নিয়ে তো আর কিছু বলা যায়না…। কিন্তু পুরো সিনেমা দেখে শুনে মনে হচ্ছিলো হায় তিনটা ঘন্টা যদি মানুষের হিংসা দ্বেষ লোভ লালসা, মারামারি, কাটাকাটি থেকে বের করে অন্যরকম একটা জগতে নিয়ে যাওয়া যায়, ইস কি ভালোই না হতো।

আমাদের সাথে থাকা বান্ধবীর ছোট্ট মেয়েটি যখন সিনেমার মাঝখানে বারবার জিজ্ঞেস করছিলো, ‘মাম হোয়াই দে আর সো এংরি” এই কথার উত্তর হাতরে বেড়াচ্ছিলাম।

আমি একটু অন্যরকম মানুষ, খুব চাই সিনেমা আমাদের মনোজগতে শুধু একটা ভালোলাগা আশা ভালোবাসায় মজিয়ে ডুবিয়ে রাখুক, আমি হয়তো ভুল, তারপরও নিজের মতামত ফেসবুকে তো বলাই যায়। আমি শুধু আমার কাছের বন্ধুদের জন্যেই আমার এই (ক্রিটিক) আলোচনাটুকু  তুলে ধরলাম কিন্তু। এর সাথে অন্যকারো মনের কথা মিলে যাওয়া নিতান্তই কাকতালীয় হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s